ওরে ভোলা মন ।লেখক কামাল হোসেন
হে বৎস, আমি তোমাকে আল্লাহকে ভয় করার, সর্বদা তাঁর নির্দেশনাবলী মেনে চলার, তাঁর স্মরণে নিজের অন্তরকে জীবিত রাখার এবং তাঁর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার উপদেশ দিচ্ছি। তুমি যদি আল্লাহর সাথে তোমার সম্পর্ককে মজবুত রাখতে পারো, তবে এর চেয়ে বিশ্বস্ত ও নিরাপদ আশ্রয় আর কী হতে পারে? উপদেশের মাধ্যমে তোমার অন্তরকে সতেজ করো, সমস্ত অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখো এবং নিজের কুপ্রবৃত্তিকে দমন করো।
দৃঢ় বিশ্বাসের মাধ্যমে তোমার জীবনকে শক্তিশালী করো, প্রজ্ঞার আলোয় চারপাশ আলোকিত করো এবং মৃত্যুকে স্মরণের মাধ্যমে প্রবৃত্তিকে বশ করো। পৃথিবীর নশ্বরতা ও বিপর্যয়গুলোকে অনুধাবন করে জ্ঞান অর্জন করো এবং দিন-রাত্রির পরিবর্তন ও সময়ের আবর্তনে ঘটে যাওয়া নেতিবাচক ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো।
অতীতের মানুষদের ইতিহাস ও তাদের জীবনের ঘটনাবলী নিজের সামনে তুলে ধরো। তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর ও কীর্তিগুলো ঘুরে দেখো এবং গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করো। চিন্তা করে দেখো—তারা কী করেছিল, পেছনে কী রেখে গেছে, কোথা থেকে তারা যাত্রা করেছিল আর আজ কোথায় গিয়ে পতিত হয়েছে? তুমি দেখতে পাবে যে, তারা তাদের সমস্ত বন্ধু-বান্ধবকে ছেড়ে এক নির্জন প্রান্তরে চলে গেছে। অতি শীঘ্রই তুমিও তাদের মতো এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে! সুতরাং, তোমার ভবিষ্যতের স্থায়ী ঠিকানার প্রস্তুতি গ্রহণ করো।
ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর মোহে পড়ে আখেরাতকে বিক্রি করে দিও না। যে বিষয়ে তোমার সঠিক জ্ঞান নেই তা নিয়ে কথা বলা থেকে বিরত থাকো এবং যে দায়িত্ব তোমাকে দেওয়া হয়নি তা নিয়ে মন্তব্য করো না। যে পথে বিভ্রান্ত হওয়ার সামান্যতম আশঙ্কা রয়েছে, সেই পথ থেকে দূরে থাকো। কারণ, পথভ্রষ্ট ও লক্ষ্যহীন হয়ে ধ্বংসের মুখে পতিত হওয়ার চেয়ে, সংশয়পূর্ণ পথ চলা থেকে বিরত থাকা অনেক শ্রেয়।
অন্যকে সৎ কাজের নির্দেশ দাও এবং নিজে সেই অনুযায়ী ধার্মিক ও সৎ হও। নিজের হাত ও জিভ দিয়ে অন্যায় কাজের প্রতিরোধ করো এবং অন্যায়কারীদের থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করো। আল্লাহর পথে সর্বদা সংগ্রাম চালিয়ে যাও। কোনো নিন্দুকের সমালোচনা যেন তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করতে না পারে। যেকোনো মূল্যে ন্যায়ের পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ো এবং তোমার ধর্মীয় পরিচয়কে নিখুঁত করে তোলো। বিপদে ধৈর্য ধারণে অভ্যস্ত হও; কারণ ন্যায়ের পথে ধৈর্য ধারণ করা চরিত্রের একটি সর্বোত্তম গুণ।
তোমার সমস্ত বিষয়ে নিজেকে আল্লাহর ওপর সমর্পণ করো; কারণ তাঁর মধ্যেই তুমি খুঁজে পাবে এক শক্তিশালী রক্ষক ও নিরাপদ আশ্রয়। পরম পবিত্র মনে তোমার প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা করো; কারণ কোনো কিছু দেওয়া বা না দেওয়ার একমাত্র ক্ষমতা কেবল তাঁরই হাতে। যতটুকু পারো আল্লাহর দরবারে রোনাজারি করো। আমার এই উপদেশগুলো বোঝার চেষ্টা করো এবং এগুলোকে অবহেলা করো না; কারণ সেই কথাই সর্বোত্তম যা মানুষের উপকারে আসে। মনে রেখো, যে জ্ঞান মানুষের কোনো উপকারে আসে না, সেই জ্ঞানের কোনো মূল্য নেই এবং তা অর্জনের কোনো যৌক্তিকতাও নেই।
হে আমার পুত্র! যখন আমি লক্ষ্য করলাম যে আমি বার্ধক্যে উপনীত হয়েছি এবং দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছি, তখন আমি তোমার জন্য এই অসিয়তনামাটি লিখতে তাড়াহুড়ো করলাম, যাতে তোমাকে নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা দিয়ে যেতে পারি। আমি ভয় পাচ্ছিলাম—আমার মনের সুপ্ত কথাগুলো তোমার কাছে প্রকাশ করার আগেই যেন মৃত্যু আমাকে গ্রাস না করে, কিংবা আমার শরীরের মতো আমার বুদ্ধিও যেন দুর্বল হয়ে না পড়ে। অথবা জাগতিক মোহ ও কুপ্রবৃত্তি যেন তোমার মনকে আচ্ছন্ন না করে ফেলে, যার ফলে সত্যকে গ্রহণ করা তোমার জন্য কঠিন হয়ে যাবে।
একটি তরুণের হৃদয় হলো উর্বর ভূমির মতো; যেকোনো বীজ বপন করার জন্য তা অত্যন্ত উপযুক্ত ক্ষেত্র। তাই তোমার অন্তর কঠোর হওয়ার আগেই বা অন্য কোনো ভ্রান্ত চিন্তায় নিমগ্ন হওয়ার আগেই আমি তোমাকে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছি। এর ফলে তুমি নিজের প্রজ্ঞা দিয়ে অপরের অভিজ্ঞতার ফসল সহজে কাজে লাগাতে পারবে এবং নিজের সঠিক কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে পারবে। এতে করে তোমাকে নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিপদের মুখোমুখি হতে হবে না। আমরা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, তা তুমি সহজেই জানতে পারবে এবং আমাদের কাছে যা গোপন ছিল, তা তোমার সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে।
হে বৎস, যদিও আমি পূর্ববর্তীদের মতো দীর্ঘ জীবন পাইনি, তবুও আমি তাদের প্রতিটি কার্যকলাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি এবং তাদের জীবনের ঘটনাবলী নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছি। আমি তাদের ধ্বংসাবশেষের মাঝে এমনভাবে ঘুরে বেড়িয়েছি যেন আমি তাদেরই একজন হয়ে গিয়েছিলাম। তাদের ইতিহাস অধ্যয়নের সময় আমার মনে হয়েছে আমি যেন তাদের প্রথম ব্যক্তি থেকে শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত সবার সাথেই ছিলাম। আর এই কারণেই আমি একটি আলোকিত ও সুখী জীবনের অধ্যায়কে অন্ধকার ও পতনের যুগ থেকে আলাদা করতে পেরেছি।
আমি সেই সমস্ত ইতিহাস থেকে তোমার জন্য সর্বোত্তম বিষয়গুলো বেছে নিয়েছি এবং অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো বর্জন করেছি। একজন স্নেহময় পিতা যেভাবে তার সন্তানের জন্য কল্যাণকর বস্তু নির্বাচন করেন, আমিও ঠিক সেভাবেই তোমাকে একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। কারণ তুমি এখন এক নতুন বয়সে পদার্পণ করেছ এবং পৃথিবীর এই মঞ্চে তুমি একেবারেই নতুন। এই সময়ে তোমার অন্তর অত্যন্ত পবিত্র এবং মন সম্পূর্ণ কলুষমুক্ত।
তাই তোমার এই প্রশিক্ষণের শুরুতে আমি তোমাকে মহান আল্লাহর পবিত্র গ্রন্থ থেকে বিভিন্ন আয়াতের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি কখনোই ইসলামী নিয়ম-কানুন, বিধি-নিষেধ এবং হালাল-হারামের শিক্ষার বাইরে যাব না। তবুও আমি আশঙ্কা করি, অন্যেরা যেভাবে তাদের নিজস্ব কামনা-বাসনা ও ভ্রান্ত মতামতের মাধ্যমে বিভ্রান্ত হয়েছে, সেই সামাজিক অবক্ষয় যেন তোমাকে আক্রমণ করতে না পারে। আমি আশা করি মহান আল্লাহ তোমাকে সরল পথ অনুসরণে সাহায্য করবেন এবং দৃঢ় সংকল্পের সাথে সঠিক পথ দেখাবেন।
সুতরাং, আমি আমার এই অসিয়ত তোমার জন্য এভাবে সাজিয়েছি—তুমি আল্লাহকে ভয় করবে, তাঁর ফরজ কাজগুলো আদায় করবে এবং তোমার পূর্বপুরুষ ও পরিবারের সৎ ও পুণ্যবান মানুষদের পথ দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করবে। কারণ, তুমি যেভাবে নিজেকে নিয়ে ভাবছ, তারাও নিজেদের নিয়ে সেভাবেই ভাবতেন। তাদের প্রচেষ্টা ছিল জ্ঞান ও সঠিক পরিচয়ের ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়া। যে বিষয়ে তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি, তারা তা থেকে নিজেদের দূরে রাখতেন। যদি তোমার মন সহজে এটি গ্রহণ করতে না চায় এবং তাদের মতো গভীরভাবে জানতে আগ্রহী হয়, তবে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তা অনুসন্ধান করো; কোনো কুসংস্কার বা শত্রুতার বশবর্তী হয়ে নয়। পবিত্র মানুষদের পথে চলার আগে পরম প্রতিপালকের সাহায্য প্রার্থনা করো এবং সংশয় ও বিভ্রান্তি থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখো।
হে আমার সন্তান, আমার এই উপদেশগুলো মনে রেখো—যিনি মৃত্যুর মালিক, তিনিই জীবনের মালিক এবং তিনিই জীবন ও মৃত্যুর সৃষ্টিকর্তা। যিনি জীবন হরণ করেন, তিনিই জীবন পুনরুত্থিত করেন এবং যিনি রোগ দেন, তিনিই আরোগ্য দান করেন। জেনে রেখো, এই পৃথিবী চিরস্থায়ী নয়; এটি আল্লাহর ইচ্ছায় বিভিন্ন পরীক্ষা, পরকালের পুরস্কার এবং তাঁর নির্ধারিত নিয়মের মধ্য দিয়ে চলছে, যার সবটুকু তুমি জানো না।
যদি তুমি এই পৃথিবীর উত্থান-পতনের কোনো কিছু বুঝতে না পারো, তবে তা তোমার নিজের অজ্ঞতা বলে বিবেচনা করো। কারণ মানুষ প্রথমে অজ্ঞ হয়েই জন্মগ্রহণ করে, তারপর ধীরে ধীরে জ্ঞান লাভ করে। এমন অনেক বিষয় আছে যা তুমি জানো না (কিন্তু আল্লাহ জানেন) এবং সেসব ক্ষেত্রে মানুষের চিন্তা বিভ্রান্ত ও দৃষ্টি ব্যর্থ হতে বাধ্য। তাই যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, জীবিকা দান করেছেন এবং উত্তম অবয়ব দিয়েছেন—তাঁরই আশ্রয় নাও। তোমার ইবাদত, মনোযোগ এবং ভয় যেন কেবল তাঁরই জন্য নিবেদিত হয়।
বৎস, মনে রেখো! পবিত্র রাসূল (সাঃ) মহান আল্লাহ সম্পর্কে যে জ্ঞান দান করেছেন, তেমন জ্ঞান আর কেউ দিতে পারেনি। সুতরাং তোমার মুক্তির জন্য তাঁর নেতৃত্ব ও নির্দেশনা অনুসরণ করো। আমি তোমাকে উপদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো কমতি করিনি এবং আমি তোমাকে যে অন্তর্দৃষ্টি দিতে পারি, তুমি নিজে চেষ্টা করলেও তা সহজে অর্জন করতে পারবে না। জেনে রেখো, তোমার প্রতিপালকের কোনো শরিক নেই। যদি থাকত, তবে তাঁর প্রেরিত নবীও তোমার কাছে আসতেন এবং তুমি তাঁর ক্ষমতা ও গুণের পরিচয় পেতে। কিন্তু আল্লাহ ঠিক তেমনই, যেমন তিনি নিজের বর্ণনা দিয়েছেন। তাঁর সার্বভৌমত্বে আপত্তি তোলার কেউ নেই। তিনি অনাদি ও অনন্ত। তিনি সবকিছুর পূর্বে ছিলেন এবং সবকিছুর পরেও থাকবেন। কোনো মানুষের অন্তর তাঁর মহানত্ব পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারে না।
মনে রেখো, তোমার সামনে এক দীর্ঘ এবং অত্যন্ত কঠিন পথ রয়েছে যা সঠিক পাথেয় ও প্রস্তুতি ছাড়া পার হওয়া অসম্ভব। তোমার পাপের বোঝা হালকা করো এবং পরকালের সফরের জন্য পুণ্য সঞ্চয় করো। তোমার সাধ্যের বাইরে অতিরিক্ত বোঝা বহন করো না, কারণ তা তোমার জন্য শাস্তি হয়ে দাঁড়াবে। যদি এমন কোনো অভাবী মানুষ পাও, যে তোমার এই বোঝা আখেরাত পর্যন্ত বহন করে নিয়ে যেতে প্রস্তুত এবং আগামীকাল তোমার বিপদের দিনে তা তোমাকে ফিরিয়ে দেবে; তবে এই সুযোগ হারিও না—দান-সদকার মাধ্যমে তোমার পাথেয় তার সাথে পাঠিয়ে দাও। কারণ, কিয়ামতের দিন যখন তুমি চরম অভাবী হবে, তখন এমন সাহায্যকারী আর খুঁজে পাবে না। তোমার সুদিনে কাউকে ঋণ দেওয়ার সুযোগ থাকলে তা হাতছাড়া করো না, যাতে তোমার কঠিন দিনে তা ফেরত পাও।
জেনে রেখো, তোমার সামনে এক সুদূরপ্রসারী উপত্যকা রয়েছে। এই সফরে হালকা বোঝাধারী ব্যক্তি ভারী বোঝাধারীর চেয়ে অনেক ভালো অবস্থায় থাকবে এবং ধীরগামী ব্যক্তিরা দ্রুতগামীদের চেয়ে পিছিয়ে পড়বে। এই পথের চূড়ান্ত গন্তব্য হলো জান্নাত অথবা জাহান্নাম। সুতরাং, পরকালে পৌঁছানোর আগেই নিজের জন্য আলো ও সামঞ্জস্য তৈরি করো। মৃত্যুর পর আর কোনো প্রস্তুতির সুযোগ থাকবে না এবং এই পৃথিবীতে ফিরে আসার কোনো পথও থাকবে না।
মন্তব্যসমূহ